রিসোর্স লাইব্রেরি
ব্লগমানসিক সমস্যা বোঝা3 min read

সিজোফ্রেনিয়া

27 বার দেখা হয়েছে২৪/৭/২০২৬
<p>সিজোফ্রেনিয়া (ইংরেজি: Schizophrenia) একটি মানসিক ব্যাধি; এ রোগের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এতে চিন্তাধারা এবং অনুভূতির প্রকাশের মধ্যে সঙ্গতি থাকে না। এর লক্ষণগুলো হলো উদ্ভট চিন্তা, বিভ্রান্তিকর বা অলীক কিছু দেখা, অসঙ্গতিপূর্ণ কথাবার্তা এবং অন্যরা যা শুনতে পায় না এমন কিছু শোনা। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি সামাজিক বা কর্মক্ষেত্রে সচরাচর অক্ষমতাজনিত অসুবিধার সম্মুখীন হন। সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণগুলি সাধারণত বয়ঃপ্রাপ্তির সময় দেখা দেয় এবং দীর্ঘ দিন স্থায়ী হয়।<br />বংশগতি, শৈশবের পরিবেশ, নিউরোবায়োলজি এবং মানসিক ও সামাজিক প্রক্রিয়াসমূহ এ রোগের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসাবে প্রতিভাত হয়। কিছু উত্তেজক মাদক এবং ওষুধ এ রোগের উপসর্গগুলোর আবির্ভাব বা এদের আরও গভীর করে বলে প্রতীয়মান হয়। বর্তমানে এ রোগের গবেষণায় নিউরোবায়োলজির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, যদিও এখনো কোনো একক জৈব কারণ শনাক্ত করা যায়নি।<br />সারাবিশ্বের ০.৩–০.৭% মানুষ এ রোগে আক্রান্ত। আক্রান্ত ব্যক্তির আচরণ পর্যবেক্ষণ ও অতীত কর্মকাণ্ড পর্যালোচনার মাধ্যমে এই রোগ নির্ণয় করা হয়। এক্ষেত্রে বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা, যেমন দীর্ঘ সময় ধরে বেকারত্ব, দারিদ্র্য, আবাসনহীনতাকে প্রধান কারণ বলে গণ্য করা হয়।</p> <p>সাধারণত কয়েক ধরনের সিজোফ্রেনিয়া দেখা যায়। যেমন—</p> <ul><li><strong>প্যারানয়েড সিজোফ্রেনিয়া (Paranoid Schizophrenia):</strong> এর কারণে আক্রান্ত ব্যক্তি অতিরিক্ত সন্দেহপ্রবণ হয়ে পড়ে, নিজেকে বিভিন্ন কারণে নির্যাতিত ভাবে এবং আশেপাশের মানুষের ব্যাপারে অহেতুক সন্দেহ প্রকাশ করে।</li><li><strong>ডিসঅর্গানাইজড সিজোফ্রেনিয়া (Disorganized Schizophrenia):</strong> এর কারণে কথাবার্তা ও চিন্তাধারায় অসংলগ্নতা দেখা দেয়। তবে এতে আক্রান্ত ব্যক্তি বিভ্রমের শিকার হয় না।</li><li><strong>ক্যাটাটোনিক সিজোফ্রেনিয়া (Catatonic Schizophrenia):</strong> আক্রান্ত ব্যক্তির আবেগ বা আচরণগত পরিবর্তন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালে তার কথা বলা ও অন্যান্য শারীরিক কার্যকলাপ আকস্মিকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।</li><li><strong>রেসিডিউয়াল সিজোফ্রেনিয়া (Residual Schizophrenia):</strong> এর কারণে আক্রান্ত ব্যক্তি বেঁচে থাকার সব আগ্রহ হারিয়ে ফেলে এবং হতাশ হয়ে পড়ে।</li><li><strong>সিজোএফেক্টিভ ডিসঅর্ডার (Schizoaffective Disorder):</strong> এর কারণে আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে সিজোফ্রেনিয়ার সাথে বিষণ্নতার মতো অন্যান্য মুড ডিসঅর্ডারের লক্ষণ দেখা দেয়।</li></ul> <p><strong>লক্ষণ</strong></p> <p>চিন্তাভাবনা ও আচরণের বিভিন্ন দিকের পরিবর্তন সিজোফ্রেনিয়ার সাধারণ লক্ষণ। এগুলোর মধ্যে পড়ে:</p> <ul><li><strong>হ্যালুসিনেশন:</strong> বাস্তবে নেই এমন কিছু বস্তু বা ব্যক্তির উপস্থিতি অনুভবের অভিজ্ঞতা।</li><li><strong>বিভ্রম (ডিলিউশন):</strong> ভুল ও অবাস্তব দৃষ্টিভঙ্গির উপর প্রতিষ্ঠিত একটি দৃঢ় বিশ্বাস।</li><li><strong>বিশৃঙ্খল চিন্তা:</strong> এর ফলে চিন্তাভাবনা ও কথোপকথনের মধ্যে সঙ্গতি থাকে না।</li><li><strong>আচরণ ও চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন:</strong> এর ফলে আচরণ অসঙ্গত ও অনির্দেশ্য হয়ে পড়ে, যা অন্যদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়।</li></ul> <p><strong>কারণ</strong></p> <p>এই রোগের সঠিক কারণ জানা যায়নি। তবে যেসব কারণকে দায়ী করা হয়, সেগুলো হলো—</p> <ul><li>জেনেটিক বা বংশগত: বাবা-মায়ের কারো এই রোগ থাকলে সন্তানেরও হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।</li><li>ভাইরাস সংক্রমণ ও মানসিকভাবে অত্যন্ত চাপগ্রস্ত পরিস্থিতি।</li><li>মস্তিষ্কে রাসায়নিক উপাদানের ত্রুটি ও নিউরোকেমিক্যাল ঘাটতি।</li><li>গর্ভাবস্থায় ও জন্মকালীন জটিলতা।</li><li>কিছু উত্তেজক মাদকদ্রব্য ও ওষুধ।</li></ul> <p><strong>ঝুঁকির বিষয়</strong></p> <p><strong>বংশগত:</strong> বংশগত কারণে সিজোফ্রেনিয়া হতে পারে, তবে কোনো নির্দিষ্ট জিন এর জন্য এককভাবে দায়ী নয়।</p> <p><strong>নিউরোট্রান্সমিটার:</strong> মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যে বার্তা বহন করে নিউরোট্রান্সমিটার। নিউরোট্রান্সমিটার ও সিজোফ্রেনিয়ার মধ্যে একটা সম্পর্ক রয়েছে।</p> <p><strong>গর্ভাবস্থা ও জন্মের জটিলতা:</strong></p> <ul><li>গর্ভাবস্থায় রক্তপাত, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বা প্রি-এক্লাম্পসিয়া</li><li>গর্ভের মধ্যে শিশুর অস্বাভাবিক বৃদ্ধি বা কম ওজন</li><li>গর্ভাবস্থায় ভাইরাসের আক্রমণ</li><li>জন্মের সময় জটিলতা, অক্সিজেনের অভাব (অ্যাসফিক্সিয়া) ও সিজারিয়ান সেকশন</li></ul> <p><strong>চাপ:</strong> চাপযুক্ত কোনো ঘটনা মানসিক বিভ্রান্তির ট্রিগার হতে পারে, যেমন চাকরি বা বাড়ি হারানো, বিবাহবিচ্ছেদ বা সম্পর্কের ইতি, কিংবা শারীরিক, যৌন, মানসিক বা জাতিগত নির্যাতন।</p> <p><strong>মাদকের ব্যবহার:</strong> গাঁজা, কোকেন, এলএসডি বা অ্যামফেটামিনের মতো কিছু নেশাদ্রব্য সিজোফ্রেনিয়া তৈরি করতে পারে।</p> <p>সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত ব্যক্তির জীবনে যতটা সমস্যা তৈরি করে, তার পরিবার ও আশেপাশের মানুষের জন্যও ঠিক ততটাই জটিলতার সৃষ্টি করে। এটি একটি জটিল ব্যাধি হলেও সঠিক চিকিৎসা, পরিবারের সাহায্য ও আন্তরিকতার মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন।</p>